বাংলাদেশে রেলভ্রমণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অনেকের সকাল শুরু হয় ট্রেনের সিটির শব্দে, আর দিনের শেষে সেই ট্রেনই হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার শান্ত আশ্রয়। সাশ্রয়ী ভাড়া, নিরাপদ ভ্রমণ এবং দীর্ঘ দূরত্বে স্বস্তিদায়ক সেবা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রেলপথ এখন আরও জনপ্রিয়। কিন্তু এই সুবিধার মাঝেও একটি বড় সমস্যা বহু বছর ধরে রয়ে গেছে—বাংলাদেশে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের শাস্তি বিষয়টি সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞানতা এবং উদাসীনতা। অনেকেই মনে করেন ট্রেন বড় যান, একজন যাত্রী বেশি বা কম হলে তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু সত্য হলো—এই ছোট ভুলটাই রেলওয়ের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।
বন্ধুর মতো বলতে গেলে, আমরা অনেকেই কখনো না কখনো ভাবতে পারি যে, স্টেশনটা যেহেতু কাছেই, একটু দূর গেলে টিকিট না কাটলেও সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি আইনানুগ অপরাধ, যার জন্য স্পষ্ট জরিমানা ও শাস্তির বিধান আছে। শুধু আইনের দিক থেকে নয়, নৈতিকভাবেও এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এই আর্টিকেলে আমরা জানবো—বাংলাদেশে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের শাস্তি, রেলওয়ে আইন, জরিমানার পরিমাণ, নৈতিকতা, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, আর বাস্তব পরিস্থিতিতে এর প্রভাব।
প্রতিটি অংশ সহজ ভাষায়, কথোপকথনের মতো করে, গবেষণার সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। যাতে আপনি পড়তে পড়তে অনুভব করেন—এটি কোনো নিয়মের বই নয়; বরং আপনার পরিচিত একজন মানুষের অভিজ্ঞতাভিত্তিক পরামর্শ।
বাংলাদেশে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের শাস্তি: আইনের স্পষ্ট অবস্থান
বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন, ১৮৯০—যা এখনও অনেকাংশে কার্যকর—বলে যে, কেউ যদি ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন, তা হলে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধে দোষী হবেন। এই আইন বেশ পুরনো হলেও, রেলভ্রমণের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই আইনটি অত্যন্ত কার্যকর।
এই ধারা অনুযায়ী, যে কোনো যাত্রী যদি বৈধ টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠেন, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট জরিমানা দিতে হবে। জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা হয়—কোন রুটে যাত্রা করছেন এবং সাধারণ টিকিটের মূল্য কত। টিকিট না কাটার মতো ছোট একটি কাজও কখনো কখনো বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ টিকিট চেকিং টিমের হাতে ধরা পড়লে আপনি শুধু লজ্জায় পড়বেন না; বরং আর্থিক জরিমানাও গুনতে হবে।
এখানে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। একবার কমলাপুর থেকে মতিঝিল যেতে ট্রেনে উঠেছিলাম। পাশেই দাঁড়ানো একজন যাত্রী গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। টিকিট চেকার যখন এলেন, তিনি স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “টিকিটটা দেখান।” লোকটি তখন মাথা নিচু করে বললেন, “ভাই, একটু তাড়াহুড়োতে টিকিট কাটা হয়নি।” এরপর তাকে দ্বিগুণ ভাড়া জরিমানা দিতে হলো। যদিও এটা মাত্র এক স্টেশনের ভ্রমণ ছিল, কিন্তু টাকা দিতে গিয়ে তার অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝলাম—আইন ছোট হোক বা বড়, ভঙ্গ করলে তার ফল ভোগ করতেই হবে।
জরিমানা ও শাস্তি: কত টাকা লাগতে পারে
যখন আমরা শুনি “জরিমানা,” তখন সাধারণত মনে করি ৫০–১০০ টাকার মতো কিছু হবে। কিন্তু বাস্তবে জরিমানার পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী—
- যাত্রীকে টিকিটের স্বাভাবিক মূল্যের দ্বিগুণ পরিমাণ জরিমানা দিতে হয়।
- যদি যাত্রী ভাড়া দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে আইনগত ব্যবস্থা—এমনকি জেল পর্যন্ত হতে পারে।
- প্রয়োজনে তাকে পরবর্তী স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হতে পারে।
- যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে টিকিটচেকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এখন একটু ভাবুন—৫০ টাকার টিকিট না কেটে ট্রেনে উঠলেন, কিন্তু ধরুন জরিমানা ধরা হলো ২০০–৩০০ টাকা। এত অল্প দূরত্বের জন্য এত বেশি জরিমানা দেওয়া কি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত? তাই নিয়ম মেনে টিকিট কাটা সব সময় লাভজনক।
এবার নিচে একটি টেবিল দেখে নিন—
বিনা টিকিটে ভ্রমণ করলে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে
| অপরাধ | শাস্তি |
|---|---|
| টিকিট ছাড়া ভ্রমণ | টিকিটের দ্বিগুণ ভাড়া জরিমানা |
| ভুল তথ্য প্রদান | অতিরিক্ত জরিমানা |
| জরিমানা পরিশোধে অস্বীকৃতি | আইনী ব্যবস্থা ও জেল |
| চেকিং টিমকে বাধা দেওয়া | শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য |
এগুলো শুনতে কঠিন মনে হলেও বাস্তবতা হলো—রেলওয়ে ব্যবস্থা চলমান রাখতে নিয়ম কঠোর থাকা জরুরি।
নিয়মিত টিকিট চেকিং অভিযান: কেন এটি কঠোর হচ্ছে
বাংলাদেশ রেলওয়ে গত কয়েক বছরে টিকিট চেকিংকে আরও কঠোর করেছে। কারণ বিনা টিকিটের যাত্রীরা শুধু আর্থিক ক্ষতি করেন না, বরং যাত্রী সুরক্ষাও ব্যাহত করেন। আপনি হয়তো মাঝে মাঝে দেখেছেন—স্টেশনে প্রবেশের সময় চেকিং টিম দাঁড়িয়ে আছে। আবার ট্রেন চলন্ত অবস্থায়ও চেকাররা অভ্যন্তরে ঘুরে ঘুরে টিকিট পরীক্ষা করেন।
এই কঠোর মনিটরিংয়ের কিছু প্রধান কারণ হলো—
- বহুল পরিমাণে রাজস্ব ক্ষতি রোধ করা।
- অতিরিক্ত যাত্রী দমন করে সিটিং ক্যাপাসিটি ঠিক রাখা।
- সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- অনিয়ম কমিয়ে আনা।
অনেক সময় যাত্রীরা ভাবেন, “টিকিট চেকার নিশ্চয়ই আজ থাকবে না।” কিন্তু বাস্তবে চেকাররা শিফট আকারে কাজ করেন। যেকোনো সময় তারা ট্রেনে উঠতে পারেন এবং হঠাৎ মনিটরিং চালাতে পারেন।
একজন যাত্রী হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই চান যাত্রা আরামে, নিরাপদে এবং নিয়মমাফিক হোক। তাই টিকিট চেকিংয়ের কঠোরতা আসলে আমাদেরই সুবিধা বাড়ায়।
বিনা টিকিটে ভ্রমণের ক্ষতি: অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা
বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ দেখায় হয়তো খুবই সাধারণ একটি কাজ, কিন্তু এর পিছনে রয়েছে মারাত্মক ক্ষতি। আমরা অনেকেই এটা ভাবি না যে, একজন মানুষের টিকিট না কাটার ফলে পুরো রেলওয়ে সিস্টেম কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে সেই প্রধান ক্ষতিগুলো তুলে ধরছি—
অর্থনৈতিক ক্ষতি
রেলওয়ে প্রতিদিন লাখো টাকা রাজস্ব পায়। যদি প্রতিদিন হাজার লোক টিকিট না কেটে ভ্রমণ করেন, তাহলে বছরে কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়। এই টাকা দিয়ে নতুন লাইন তৈরি, স্টেশন সংস্কার, বগি উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবা বাড়ানোর কাজ করা যেত।
যাত্রীদের দুর্ভোগ
আপনি টিকিট কেটে আসন পেলেন, কিন্তু দেখলেন আপনার সিটে আগে থেকেই কেউ বসে আছে—এ দৃশ্য খুবই পরিচিত। অনেক সময় এই সমস্যা তৈরি হয় বিনা টিকিটে ভ্রমণকারীদের কারণে। এতে অসস্তি, বিশৃঙ্খলা এবং ঝগড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রেলওয়ে ব্যবস্থাপনার ব্যাঘাত
যাত্রীদের সঠিক সংখ্যা জানলে সময়সূচী, বগি বরাদ্দ এবং সেবার মান ঠিক থাকে। কিন্তু বিনা টিকিটের যাত্রীরা হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন।
এগুলো সব মিলিয়ে দেশের রেলব্যবস্থা ক্ষতির মুখে পড়ে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ: বিনা টিকিটে ভ্রমণ কেন নৈতিকভাবে ভুল
এই অংশটি অনেকের কাছে ব্যতিক্রমী মনে হতে পারে, কিন্তু সমাজ ও ধর্ম আমাদের নৈতিকতা গঠনে ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমাদের সবার, এবং এটি ব্যবহার করতে হলে সঠিক নিয়ম মেনে চলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ধর্মীয় দৃষ্টিতে, অন্যের হক নষ্ট করা একটি বড় ভুল। পবিত্র কোরআনে এবং সাহাবিদের জীবনে যে শিক্ষা বারবার এসেছে তা হলো—রাষ্ট্রের সম্পদ কখনো ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
কোরআনে বলা হয়েছে—
“যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, সে কিয়ামতের দিন তার খিয়ানতের বস্তুসহ হাজির হবে।”
এই আয়াত ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্রের সম্পদ অপব্যবহার করা কোনো ছোট ভুল নয়। বিনা টিকিটে ভ্রমণও সেই সম্পদের অপব্যবহার।
এই আলোচনা শুনে অনেকেই হাসতে পারে এবং ভাবতে পারে—টিকিট না কাটার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক আবার কী? কিন্তু সম্পর্ক আছে। কারণ নৈতিকতা আর শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া কোনো সমাজই এগোতে পারে না।
টিকিট সংগ্রহের সহজ উপায়: অনলাইন ও অফলাইন সুবিধা
অনেকেই মনে করেন টিকিট কাটা ঝামেলাপূর্ণ। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। ডিজিটাল সিস্টেম আসার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কেনা আগের মতো সময়সাপেক্ষ নয়। এখানে দুইটি জনপ্রিয় উপায়—
অনলাইন টিকিটিং
- বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
- কমপক্ষে ১০টি বিশ্বস্ত মোবাইল অ্যাপ
এগুলোর মাধ্যমে যেকোনো সময় টিকিট কাটা যায়।
স্টেশন কাউন্টার
অনেকে এখনো কাউন্টারের টিকিটে বেশি স্বস্তি পান। কারণ হাতে টিকিট থাকলে একটি আলাদা নিশ্চিন্ততা থাকে।রেলভ্রমণে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা: কেন টিকিট কাটা সবার দায়িত্ব
ট্রেন ভ্রমণ আমাদের জীবনে শুধু একটি যাতায়াত মাধ্যম নয়; এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। প্রতিটি নাগরিক যখন নিয়ম মেনে টিকিট কেটে ভ্রমণ করেন, তখন পুরো সিস্টেমটাই উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। ভাবুন তো—একটি ট্রেনে একশো যাত্রী আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ২০ জনই যদি বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন, তাহলে বাকি ৮০ জনের টিকিট কাটার অর্থই থাকে সিস্টেম টিকিয়ে রাখার একমাত্র উৎস। এতে অন্যায়ভাবেই দায়ভার পড়ে নিয়ম মানা যাত্রীদের উপর।
এই কারণে বাংলাদেশে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের শাস্তি শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি অন্যদের প্রতি অবিচারের শামিল। এটা অনেকটা লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে জমা না দেওয়ার মতো—যদি একেকজন ছোট ছোটভাবে অনিয়ম করেন, তবে সামগ্রিক ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যায়। জীবনের সব ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে, আর রেলভ্রমণও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই যে যাত্রাই হোক, ছোট হোক বা দূর, টিকিট কেটে ভ্রমণ করা একটি মৌলিক নীতি।
এখানে অনেকেই বলেন—“ভাই, স্টেশন তো দুই মিনিটের পথ, এর জন্য আবার টিকিট কী?” কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই মিনিটের ভ্রমণই যদি দিনে হাজারো মানুষ করেন বিনা টিকিটে, তাহলে রেলওয়ের বার্ষিক ক্ষতি দাঁড়ায় কোটি টাকায়। এটা শুধু সরকারের ক্ষতি নয়, আমাদের সবার ক্ষতি। কারণ সেই অর্থ দিয়ে নতুন লাইন, নতুন ইঞ্জিন, উন্নত বগি, ভালো স্টেশন—সবই করা সম্ভব।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা: আধুনিক সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা
বাংলাদেশ রেলওয়ে গত কয়েক বছর ধরে ট্র্যাক, বগি, ইঞ্জিন, সিগন্যাল, স্টেশন—প্রতিটি খাতে উন্নয়নের চেষ্টা করছে। নতুন প্রকল্প, আধুনিক প্রযুক্তি, অনলাইন টিকিটিং—এগুলো সবই যাত্রীদের ভালো সেবা দেওয়ার অংশ। কিন্তু একই সময়ে যখন রেলওয়ে বিনা টিকিটের যাত্রীদের কারণে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে, তখন এই উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
এই কারণে কর্মকর্তারা এখন আরও কঠোর—
- প্রতিটি স্টেশনে নিয়মিত টিকিট চেকিং
- চলন্ত ট্রেনে মোবাইল চেকিং টিম
- বিশেষ অভিযানে এক দিনে হাজার লোকের টিকিট পরীক্ষা
- অনলাইন ও কাউন্টার সিস্টেম মনিটরিং
- জাল টিকিট প্রতিরোধে সফটওয়্যার আপডেট
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন—“টিকিট কাটুন, কারণ এই এক কাজই আমাদের সেবা আরও ভালো করতে সাহায্য করে।” তাদের এই কথার অর্থ খুবই গভীর। প্রতিটি যাত্রী যখন নিয়ম মেনে চলেন, তখন একটি জাতীয় সম্পদকে রক্ষা করা হয়।
কেন অনেকেই টিকিট কাটেন না: বাস্তব কারণ ও সমাধান
অনেকেই মনে করেন, টিকিট না কাটা মানেই শুধু অসদাচরণ বা ইচ্ছাকৃত অপরাধ। আসলে কিছু বাস্তব কারণও আছে—
১. শেষ মুহূর্তে ট্রেনে দৌড়ে ওঠা
অনেকেরই অফিস, স্কুল বা কাজের তাড়া থাকে। তারা ভাবে পরে টিকিট কিনবে। কিন্তু পরে আর কেনা হয় না।
২. ভিড়ের কারণে কাউন্টারে যাওয়া যায় না
বিশেষ করে সকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বড় শহরগুলিতে এমনটি হয়। ভিড় দেখে অনেকে লাইন ধরতে চায় না।
৩. অনলাইন সিস্টেম না জানা
বয়স্ক যাত্রী বা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নন—এমন লোকদের জন্য অনলাইন টিকিটিং কঠিন হতে পারে।
৪. ‘কিছু হবে না’—এমন ভুল ধারণা
অনেকেই ভাবেন, চেকার তো আসবেই না। এই ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
সমাধান
- অনলাইন টিকিটিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো
- স্টেশনে দ্রুত পরিষেবা নিশ্চিত করা
- মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার শেখানো
- নিয়মিত গণসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন
এগুলো করা গেলে অনেকেই সহজে নিয়ম মেনে টিকিট কাটবেন।
বিনা টিকিটে ভ্রমণ বনাম রেলওয়ে উন্নয়ন: কীভাবে ক্ষতি বাড়ে
এখন আমরা একটু গভীরভাবে দেখি যে বিনা টিকিটে ভ্রমণের ফলে রেলওয়ে প্রধানত কোন ক্ষেত্রগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১. রাজস্ব ক্ষতি
প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন—যা বার্ষিক কোটি টাকার ক্ষতি তৈরি করে।
২. উন্নয়ন প্রকল্প থেমে যায়
ক্ষতির কারণে নতুন বগি, স্টেশন সংস্কার, ট্র্যাক উন্নয়ন প্রায়ই বিলম্বিত হয়।
৩. যাত্রী সেবার মান কমে
সিটিং ব্যবস্থার সমস্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, এবং সঠিক সময়ে ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণে অভাব তৈরি হয়।
৪. নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে
অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ট্রেনের বগিতে চাপ বেড়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সারাংশে
বিনা টিকিটে ভ্রমণ একটি ছোট অপরাধ মনে হলেও এর প্রভাব খুবই বড়। তাই এই অভ্যাস পুরো ব্যবস্থাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে।
শাস্তি এড়াতে কিছু করণীয়: সহজ ও ব্যবহারিক পরামর্শ
নিয়ম মানা কঠিন নয়—বরং সহজ। শুধু কিছু অভ্যাস তৈরি করলেই সব সমাধান হয়ে যায়।
১. যাত্রার আগে ২ মিনিট সময় রাখুন
এতে কাউন্টারে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
২. অনলাইন টিকিটিং অ্যাপ ইনস্টল রাখুন
যেকোনো জায়গা থেকে দ্রুত টিকিট কাটা যায়।
৩. ই-ওয়ালেট ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার
টিকিট কেনা আরও সহজ হয়।
৪. যাত্রার সময় টিকিট হাতে রাখার অভ্যাস করুন
টিকিট চেকার এলে খুঁজে বের করতে সময় লাগে না।
৫. শেষ মুহূর্তে ওঠার চেষ্টা কমান
এতে ভুল করে টিকিট না কাটার সম্ভাবনা কমে।
উপসংহার: দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের ভূমিকা
সব শেষে এসে আবার একটি কথাই বলতে হয়—বাংলাদেশে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণের শাস্তি শুধু জরিমানা বা আইনের বিষয় নয়। এটি নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত সততার সঙ্গে জড়িত। রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি টিকিট না কাটার মতো ছোট অনিয়মকে স্বাভাবিক করে নেই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দুর্বল রেলব্যবস্থা পাবে।
টিকিট কাটুন। নিয়ম মেনে চলুন। একটি ভালো রেলওয়ে সিস্টেম আপনার ছোট অবদানের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে।
FAQs: সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. বিনা টিকিটে ট্রেনে উঠলে কী হয়?
টিকিটের দ্বিগুণ পরিমাণ জরিমানা দিতে হয়। জরিমানা না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২. জরিমানা কত টাকা হতে পারে?
টিকিটের দাম অনুযায়ী দ্বিগুণ বা তার বেশি হতে পারে।
৩. জেল হতে পারে কি?
হ্যাঁ। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে জেল পর্যন্ত হতে পারে।
৪. অনলাইন টিকিট কি নিরাপদ?
হ্যাঁ। রেলওয়ের অফিসিয়াল সিস্টেম অত্যন্ত নিরাপদ ও দ্রুত।
৫. টিকিট চেকার না এলে কি সমস্যা নেই?
না। এটি আইন লঙ্ঘন। ধরা পড়লে বড় জরিমানা হবে।
৬. একই দিনে টিকিট পাওয়া না গেলে কী করবেন?
স্টেশন কাউন্টারে চেষ্টা করুন বা ভিন্ন সময়ের ট্রেন বিবেচনা করুন।
৭. শিশুদের জন্য কি টিকিট লাগে?
নির্দিষ্ট বয়সের বেশি হলে অবশ্যই টিকিট লাগে।
৮. বিনা টিকিটে ভ্রমণ কেন এত বড় সমস্যা?
এটি রেলওয়ের প্রতিদিনের আয় কমায়, উন্নয়ন ব্যাহত করে এবং যাত্রীসেবা নষ্ট করে।